মার্কিন শুল্ক অনিশ্চয়তা

এশিয়ায় ভেঞ্চার ক্যাপিটাল কার্যক্রমে ধীরগতি

চলতি বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে এশিয়ায় ভেঞ্চার ক্যাপিটাল (ভিসি) বিনিয়োগের গতি।

চলতি বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে এশিয়ায় ভেঞ্চার ক্যাপিটাল (ভিসি) বিনিয়োগের গতি। বিশ্লেষকরা বলছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আরোপিত অস্থির শুল্কনীতি ও সামগ্রিক বাজার পরিস্থিতির কারণে সৃষ্ট তারল্য সংকট ও দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা বাজারকে চাপে ফেলেছে। খবর নিক্কেই এশিয়া।

বাজার বিশ্লেষক সংস্থা পিচবুকের সাম্প্রতিক তথ্যানুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথম তিন প্রান্তিকে (জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর) এশিয়ায় ভিসি বিনিয়োগ দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৮৯০ কোটি ডলারে, যা গত বছরের মোট বিনিয়োগের অর্ধেকের কিছু বেশি।

গত ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এশিয়ায় মোট ৭ হাজার ৫৮৯টি চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে, যা প্রান্তিক ভিত্তিতে অব্যাহতভাবে কমছে। বিনিয়োগকারীরা সতর্ক অবস্থান নেয়ায় ২০২৪ সালের তুলনায় এ বছর এশিয়ার মোট চুক্তির সংখ্যা ৬০ শতাংশেই সীমিত থাকবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে পিচবুক।

এশিয়ার পাশাপাশি বৈশ্বিক পর্যায়ে ভিসি তহবিল সংগ্রহের গতিও ধীর, যা তারল্য সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এ বছর বৈশ্বিক ফান্ড রেইজিং ২০১৫ সালের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছতে পারে। এশিয়ায় নতুন ফান্ড গঠনের প্রবণতাও দুর্বল—প্রথম তিন প্রান্তিকে মাত্র ২৭৭টি ফান্ড গঠিত হয়েছে, যা মিলিতভাবে তুলেছে ২ হাজার ৮০০ কোটি ডলার।

এশিয়ায় বিনিয়োগকারীরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করছেন। এ খাতে জানুয়ারি-সেপ্টেম্বরে বিনিয়োগ হয়েছে ১৯ হাজার ২৭০ কোটি ডলার, যা ২০২১ সালের রেকর্ডকে ছাড়িয়ে গেছে। তবে অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় এশিয়ায় এআই-সম্পর্কিত চুক্তির অনুপাত সর্বনিম্ন, মাত্র ১৯ দশমিক ১ শতাংশ।

এছাড়া এশীয় সার্বভৌম তহবিল ও ঐতিহ্যগতভাবে এশিয়াকেন্দ্রিক বিদেশী বিনিয়োগকারীরা এখন বিনিয়োগের দিক পরিবর্তন করছেন। তারা পুঁজি স্থানান্তর করছেন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে। ফলে এশিয়ার ভিসি ফান্ডগুলোর জন্য অর্থ সংগ্রহ ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।

রফতানিনির্ভর এ অঞ্চল নতুন বৈশ্বিক বাণিজ্যনীতির চাপে বিভিন্ন ধরনের জটিলতার মুখে পড়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সাম্প্রতিক মাসগুলোয় প্রায় সব বাণিজ্য অংশীদার দেশ ও কিছু নির্দিষ্ট শিল্পপণ্যের ওপর ব্যাপক শুল্ক আরোপ করেছেন। এর প্রভাবে বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনে বড় ভূমিকা রাখা এশিয়ার দেশগুলো শ্লথ প্রবৃদ্ধি আশঙ্কা করছে। বিনিয়োগকারীরা এখন সরবরাহ চেইন ও উৎপাদন সক্ষমতা উন্নয়নে মনোযোগ দিচ্ছেন। পাশাপাশি বাণিজ্যনীতি বা ভূরাজনৈতিক চাপ থেকে তুলনামূলকভাবে সুরক্ষিত খাতে বিনিয়োগ করছেন তারা।

পিচবুকের যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ভেঞ্চার গবেষণা পরিচালক কাইল স্ট্যানফোর্ড বলেন, ‘বৈশ্বিক বাণিজ্য পুনর্গঠনের ফলে সরবরাহ চেইন ও উৎপাদন সক্ষমতার ওপর নতুন গুরুত্ব এসেছে, এটি বাজার কার্যক্রমে কিছুটা প্রাণসঞ্চার করেছে।’

গত এক দশকে এশিয়ার ভিসি চুক্তির ৬০ শতাংশেরও বেশি রয়েছে চীনে। কিন্তু তিন বছর ধরে দেশটিতে ভিসি চুক্তির হার ক্রমেই কমছে এবং এবারো তা ডাবল ডিজিট পতনের পথে রয়েছে। মূলত ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে বিদেশী বিনিয়োগকারীরা চীনে বিনিয়োগে অনাগ্রহী হয়ে পড়েছেন।

কাইল স্ট্যানফোর্ড আরো বলেন, ‘দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, জাপান ও ভারতের ভিসি বাজারে কিছুটা প্রবৃদ্ধি দেখা গেলেও চলমান অনিশ্চয়তার কারণে প্রত্যাশিত পরিমাণে পুঁজিপ্রবাহ ঘটেনি।’

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো যৌথভাবে ভিসি খাতকে গতিশীল করতে পদক্ষেপ নিচ্ছে। এর মধ্যে এপ্রিলে আঞ্চলিক পর্যায়ে নতুন স্টার্টআপ নির্দেশনা প্রণয়ন হয়েছে। বছরের শুরুতে সার্বভৌম তহবিলের মাধ্যমে ভিসি ফার্মে বিনিয়োগের ঘোষণা দেয় মালয়েশিয়া, প্রাথমিক পর্যায়ের বিনিয়োগে দেবে কর প্রণোদনাও। তবে কাইল স্ট্যানফোর্ড বলেন, ‘এ অঞ্চলে চলতি বছর ফান্ড গঠনের সংখ্যা ১০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন হতে পারে।’

অন্যদিকে বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এশিয়া থেকে বিনিয়োগ প্রত্যাহার কার্যক্রম বেড়েছে। কারণ যুক্তরাষ্ট্রে শেয়ারবাজারে আইপিও কার্যক্রম পুনরুদ্ধার হচ্ছে। পিচবুকের তথ্যানুযায়ী, বছরের শুরু থেকে এশিয়ায় বিনিয়োগ প্রত্যাহার দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ৩২০ কোটি ডলার, যা গত বছরের স্তর ছাড়িয়ে যাওয়ার পথে রয়েছে।

আরও